Follow Us

তাপদাহের মাঝেই স্বস্তির খবর: ধেয়ে আসছে মৌসুমী বায়ু, দেশজুড়ে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস

আকৃতি:
তাপদাহের মাঝেই স্বস্তির খবর: ধেয়ে আসছে মৌসুমী বায়ু, দেশজুড়ে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস

বিশেষ প্রতিবেদক, LiveSchoolBD

গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্র আর ভ্যাপসা গরমে যখন সারা দেশের জনজীবন ওষ্ঠাগত, ঠিক তখনই এক পশলা স্বস্তির বারতা নিয়ে হাজির হয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। বেশ কিছুদিন ধরে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বয়ে যাওয়া মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহের অবসান ঘটিয়ে খুব শিগগিরই বৃষ্টির দেখা মিলতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিস্থিতি ও স্থানীয় সিনপটিক অবস্থার নিবিড় বিশ্লেষণের পর আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশের দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। এর প্রভাবে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই সারা দেশে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

সিনপটিক অবস্থা: আবহাওয়ার পটভূমি

কোনো নির্দিষ্ট এলাকার আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার আগে সেখানকার ‘সিনপটিক অবস্থা’ বা বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ও বাতাসের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা লঘুচাপের একটি বর্ধিতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুরু করে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। আবহাওয়া বিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের লঘুচাপ সাধারণত জলীয় বাষ্প টেনে আনে এবং মেঘ সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক খবর হলো, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশের টেকনাফ উপকূল পর্যন্ত অগ্রসর হতে পারে। এই মৌসুমী বায়ুই মূলত বাংলাদেশে বর্ষাকাল নিয়ে আসে। টেকনাফ দিয়ে এই বায়ু দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে তা সারা দেশেই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে এবং চলমান তাপপ্রবাহকে প্রশমিত করবে

চলমান তাপপ্রবাহ: পুড়ছে দেশের বিস্তীর্ণ জনপদ

বৃষ্টির সুসংবাদ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি বেশ কষ্টদায়ক। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের একটি বড় অংশের ওপর দিয়ে এখন মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে

আবহাওয়া বিজ্ঞানের মানদণ্ড অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৩৬.০° থেকে ৩৭.৯° সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ এবং ৩৮.০° থেকে ৩৯.৯° সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বলা হয়। বর্তমানে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলাসহ রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের ওপর দিয়ে এই তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে (ঢাকায় সকাল ৬টায় আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৮৬%) গরমের অনুভূতি প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি অনুভূত হচ্ছে

আগামী ৫ দিনের আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি: ধাপে ধাপে বৃষ্টির বিস্তার

আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগামী পাঁচ দিনে বৃষ্টিপাতের বিস্তৃতি ও পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে। আন্তর্জাতিক মানের আবহাওয়া বিশ্লেষণের আদলে এই ৫ দিনের পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রথম ও দ্বিতীয় দিন (৩-৪ জুন): প্রথম দিন সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এই সময়ে রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণও হতে পারে। দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে

দ্বিতীয় দিনে বৃষ্টির পরিধি কিছুটা বাড়বে। রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে। এই দিনে সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস পেতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনবে

তৃতীয় ও চতুর্থ দিন (৫-৬ জুন): এই দুই দিনে আবহাওয়ার দৃশ্যপটে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। ৫ জুন রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়ার সাথে বিদ্যুৎ চমকানো এবং বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হতে পারে। দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। এই সময়ে সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা আরও কিছুটা হ্রাস পাবে। ৬ জুনেও দেশের অনেক জায়গায় এই বৃষ্টিপাতের ধারা অব্যাহত থাকবে

পঞ্চম দিন (৭ জুন) ও পরবর্তী অবস্থা: পঞ্চম দিনে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকবে। এর ফলে রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। ভারী বর্ষণের সতর্কতাও রয়েছে দেশের কিছু কিছু স্থানে। এই দিনে তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও, বর্ধিত ৫ দিনের পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টিপাতের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে

জেলাভিত্তিক চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া ও আঞ্চলিক বৈষম্য

আবহাওয়া অধিদপ্তরের স্টেশন পর্যবেক্ষণ ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রার এক বিশাল বৈষম্য চোখে পড়ে

সর্বোচ্চ তাপমাত্রার দিক থেকে দেশের উত্তরের জেলাগুলো সবচেয়ে বেশি ভুগছে। ৩ জুনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে রংপুর বিভাগের সৈয়দপুরে, যা ছিল ৩৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর কাছাকাছি তাপমাত্রা ছিল দিনাজপুরে (৩৮.৩° সেলসিয়াস) এবং রাজশাহীতে (৩৭.৫° সেলসিয়াস)

অন্যদিকে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট বিভাগে আবহাওয়া ছিল তুলনামূলক বেশ শীতল। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে সিলেটে, যার পরিমাণ ২৪ মিলিমিটার। পাশাপাশি, দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও ছিল সিলেটে, মাত্র ২৩.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস

জনজীবন, কৃষি ও অর্থনীতিতে প্রভাব

আবহাওয়ার এই পালাবদল বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণে মাঠে থাকা ফসলের যে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল, আসন্ন এই বৃষ্টিপাত তা থেকে কৃষকদের রক্ষা করবে। মাটি তার প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ফিরে পাবে

তবে, বজ্রপাত ও ঝড়ো হাওয়ার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কালবৈশাখী বা বজ্রঝড়ের সময় কৃষকদের খোলা মাঠে কাজ করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা

স্বাস্থ্যবিধি ও সতর্কতা

চলমান তাপপ্রবাহ এবং আসন্ন বৃষ্টির কথা বিবেচনায় রেখে জনস্বাস্থ্যের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন: ১. পর্যাপ্ত জল পান: অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। তাই নিয়মিত বিশুদ্ধ পানি ও স্যালাইন পান করতে হবে। ২. হালকা পোশাক: সুতির হালকা রঙের পোশাক পরিধান করা উচিত। ৩. বজ্রপাতে সতর্কতা: বৃষ্টির সময় বিদ্যুৎ চমকালে কোনোভাবেই খোলা স্থানে বা গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া যাবে না। নিরাপদ ও পাকা ভবনের নিচে অবস্থান করতে হবে

উপসংহার

তীব্র তাপপ্রবাহের পর দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর আগমন প্রকৃতিরই একটি আশীর্বাদ। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের এই পূর্বাভাস দেশের মানুষকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আগামী কয়েকদিনের এই বৃষ্টির পরশ কেবল মাটিকেই সিক্ত করবে না, বরং ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত জনজীবনে বয়ে আনবে অনাবিল প্রশান্তি।

Official Full report here.

admin
লেখক

admin

7 টি প্রতিবেদন
সকল প্রতিবেদন দেখুন

প্রথম মন্তব্য করুন!

মন্তব্য করুন