টানা কয়েক দিনের জল্পনা-কল্পনা, সংশয় আর অপেক্ষার অবশেষে অবসান ঘটল। ঈদুল আজহা এবং গ্রীষ্মকালীন অবকাশ উপলক্ষে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আজ শনিবার (২৩ মে) থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে দীর্ঘ ছুটি। একটানা ১৫ দিনের এই অবকাশকালীন ছুটি চলবে আগামী ৬ জুন (শনিবার) পর্যন্ত। দীর্ঘ এই ছুটি কাটিয়ে আগামী ৭ জুন (রবিবার) থেকে আবারও মুখরিত হয়ে উঠবে স্কুলের আঙিনা, শিক্ষার্থীরা ফিরবে তাদের নিয়মিত পাঠদানে।
শুক্রবার (২২ মে) রাতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. তানভীর মিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে এই চূড়ান্ত ঘোষণার আগে স্কুল খোলা থাকা বা বন্ধের বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং মাঠপর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাঝে এক ধরনের বিভ্রান্তি ও প্রশাসনিক ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল।
যে কারণে তৈরি হয়েছিল এই জটিলতা ও অনিশ্চয়তা
এই জটিলতার মূল কারণ ছিল রোজার ছুটির কারণে তৈরি হওয়া শিখন ঘাটতি মেটানোর বিশেষ নির্দেশনা এবং বাৎসরিক শিক্ষাপঞ্জির মধ্যকার একটি ছোট অসামঞ্জস্যতা।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বাৎসরিক ছুটির তালিকা বা শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী, এই ছুটিটি মূলত আগামী ২৪ মে (রবিবার) থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে, পবিত্র রমজান মাসে স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা পুষিয়ে নিতে মন্ত্রণালয় এর আগে টানা ১০টি শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছিল। সেই হিসাবটি মেলাতে গেলে, আজ ২৩ মে (শনিবার) প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা থাকার কথা ছিল।
মাঠপর্যায়ে যোগাযোগের অভাব
এই বিশেষ নির্দেশনার কারণে শনিবার স্কুল খোলা থাকবে নাকি বন্ধ হবে—তা নিয়ে চরম দ্বিধায় পড়েন শিক্ষক ও অভিভাবকরা। প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন বা অধিদপ্তর থেকে সময়মতো সুনির্দিষ্ট কোনো প্রজ্ঞাপন বা ঘোষণা না আসায় বিষয়টি আরও ঘোলাটে হয়। এমনকি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাও ছুটির বিষয়ে শিক্ষকদের সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা দিতে পারছিলেন না। ফলে ছুটির ঠিক আগের দিন পর্যন্ত একধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল।
মিড-ডে মিলের নির্দেশনায় মিলেছিল ছুটির আগাম ইঙ্গিত
তবে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত মিলেছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিড-ডে মিল বা দুপুরের খাবার বিতরণের একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা থেকে। ওই নির্দেশনায় সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, ২২ মে (শুক্রবার) থেকেই বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের খাবার সরবরাহ বন্ধ থাকবে। এই নির্দেশনাটি মূলত পরোক্ষভাবে বার্তা দিচ্ছিল যে, শনিবার হয়তো বিদ্যালয়গুলোতে আর ক্লাস হচ্ছে না এবং ছুটি শুরু হয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘ এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটি শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে কতটা জরুরি?
টানা ক্লাস ও পরীক্ষার চাপের পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটি শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশাল আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। শিশু মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, একটানা পড়াশোনার একঘেয়েমি কাটাতে এবং মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘ ছুটির কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে ঈদের মতো বড় উৎসবের আগে এই ছুটি শিশুদের পারিবারিক মেলবন্ধন দৃঢ় করতে এবং সামাজিক উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে সাহায্য করে।
তাছাড়া, গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে এই ছুটি কোমলমতি শিশুদের শারীরিক সুস্থতার জন্যও অত্যন্ত যুগোপযোগী একটি সিদ্ধান্ত। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (DPE) অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করেই ছুটির বিন্যাস করা হয়।
শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে সবার স্বস্তি
অবশেষে সব সংশয় দূর করে শুক্রবার রাতেই ছুটি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষাপঞ্জির নির্ধারিত সময় ২৪ মে’র পরিবর্তে এক দিন আগেই, অর্থাৎ ২৩ মে (শনিবার) থেকেই প্রাথমিকে ছুটি কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
যেহেতু শুক্রবার ও শনিবার সাধারণত দেশের সাপ্তাহিক ছুটি থাকে, তাই সেদিক বিবেচনা করলে শিক্ষার্থীদের মূলত গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) ছুটির আগেই শেষ ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে কার্যত শুক্রবার থেকেই শিক্ষার্থীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত এই দীর্ঘ ছুটির আনন্দ উপভোগ করা শুরু করেছে। আগামী ৭ জুন নতুন উদ্যমে ক্লাসে ফেরার আগ পর্যন্ত এই ছুটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দারুণ এক স্বস্তি দেবে।
প্রথম মন্তব্য করুন!